কিংবদন্তি বিমানযোদ্ধা সাইফুল আজম আর নেই

  • অনলাইন
  • সোমবার, ১৫ জুন ২০২০ ১২:২৭:০০
  • কপি লিঙ্ক

বিশ্বের অন্যতম সেরা চৌকস সুনিপুণ বিমানযোদ্ধা ও লিভিং ঈগল হিসেবে খ্যাত গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব:) সাইফুল আজম আর নেই। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ৭৯ বছর বয়সে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে গতকাল রোববার বেলা ১টায় তিনি ইন্তেকাল করেন। 

অসীম সাহসী এই বৈমানিক ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং একাধিক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে ইতিহাসে স্থান করে নেন। আরব ইসরাইল যুদ্ধে তিনি ইরাক জর্দান সীমান্তে ইসরাইলের তিনটি যুদ্ধ বিমান একাই ভূপাতিত করেন। আর পাক-ভারত যুদ্ধেও পশ্চিম সীমান্তে তিনি শত্রুপক্ষের দু’টি বিমান ভূপাতিত করেন। তাকে পাকিস্তানের তৃতীয় সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘সিরাত-ই- জুরাতে’ ভূষিত করা হয়। তৎকালীন সেসনা টি৩৭ এবং সাবোর জেট এফ-৮৬ দিয়েই বিমানযুদ্ধে শত্রুর মেরুদণ্ড ভেঙে দেন তিনি। সাইফুল আজমের অসম সাহসিকতার এই বিমানযুদ্ধের কাহিনী বিশ্বের বহুদেশের বৈমানিকদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের ২২ জন সেরা বৈমানিকের অন্যতম হিসেবে তাকে লিভিং ঈগলের খেতাব প্রদান করে।

সাইফুল আজম ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। পাবনা জেলার খাগোরবাড়ীয়ায় ১৯৪১ সালে তার জন্ম। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানি এয়ারফোর্স একাডেমি রিসালপুরে যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিডি পাইলট হিসেবে কমিশন লাভ করেন। তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের রিসালপুর মৌরিপুর এবং ঢাকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে তাকে রয়্যাল জর্দানিয়ান এয়ারফোর্সে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়। সেখান থেকেই তিনি ইরাক সীমান্তে আরব ইসরাইল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর তিনি বাংলাদেশ এয়ারফোর্সে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে তিনি গ্রুপ ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি সিভি এভিয়েশন অথরিটির চেয়ারম্যান এফডিসির এমডি হিসাবে ও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে পাবনা-৩ আসন থেকে তিনি বিএনপির সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। শেষ জীবনে তিনি ঢাকার মহাখালী ডিওএইচএসে অবসর জীবনযাপন করছিলেন।

এখন পর্যন্ত আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে ইসরায়েলের সর্বোচ্চ সংখ্যক বিমান ঘায়েল করার রেকর্ড ক্যাপ্টেন সাইফুল আজমের।

জুন ৬ , ১৯৬৭। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ চলছে। তৎকালীন পাকিস্তান এয়ারফোর্স থেকে ডেপুটেশনে আসা গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম পশ্চিম ইরাকের এক বিমান ঘাটিতে অবস্থান করছেন। অনেকটা ভোজবাজির মতোই আকাশে চারটা ইজ্রায়েলি বিমানের ( যাদের কে এস্কোর্ট করছিলো দুইটা ইস্রায়েলি মিরেজ ফাইটার ) উদয় হয়। আকস্মিক আক্রমণে ইরাকি এয়ারফোর্স বিপর্জস্ত। ইসারায়েলি ক্যাপ্টেন ড্রোর একের পর এক ইরাকি বিমানের ভবলীলা সাঙ্গ করে চলেছে। তার সাথে সঙ্গী হিসাবে আছে আরেক ইজ্রায়েলি ক্যাপ্টেন গোলান। এই অবস্থায় আকাশে উড়াল দেন সাইফুল আজম। উড়াল দেবার কিছুক্ষণের মাঝেই তার উইংম্যান কেও ফেলে দেয় ইজ্রায়েলি ক্যাপ্টেন ড্রোর। কিন্তু সাইফুল আজম অন্য ধাতুতে গড়া। একে একে গোলান, ড্রোর সবার প্লেন ফেলে দেন তিনি। মোটামুটি একা লড়াই করে ইজ্রায়েলি বিমান গুলোকে ইরাকের আকাশ ছাড়তে বাধ্য করেন তিনি।

১৯৪১ সালে পাবনা জেলার খগড়বাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই সাইফুল আজম। উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পাশ করে ১৯৫৬ সালে উচ্চতর শিক্ষার্থে পশ্চিম পাকিস্তান যান। ১৯৬০ সালে জিডি পাইলট ব্রাঞ্চের একজন পাইলট হন তিনি। ১৯৭১ সালের পূর্বে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ১৯৬৭ সালের ৬ জুন তাকে ইরাকি বিমান বাহিনীতে বদলি করা হয়। বিমানঘাঁটি আক্রমণের সময় তিনি পশ্চিম ইরাকে ছিলেন।

সাইফুল আজম তার বর্ণাঢ্য জীবনে নিজেই কিংবদন্তির ইতিহাস রচনা করেছিলেন। পৃথিবীর ২২ জন “লিভিং ঈগলের” মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

বাংলাদেশ জমিন/ সংবাদটি শেয়ার করুন

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

মন্তব্য