রাজধানীর কাছে ধারাবাহিক কম্পন: বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি?


২১ নভেম্বর সকাল। ঢাকার মানুষ যেমন একটি স্বাভাবিক দিনের কাজে ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তেই আচমকা তীব্র কেঁপে ওঠে ভবনগুলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো রাজধানীতে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। পরে জানা গেলরিখটার স্কেলে ৫.৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, যার কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর মাধবদী; রাজধানী থেকে মাত্র ২৫৪০ কিলোমিটার দূরত্বে।

গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে এটি ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এই বড় কম্পনের পর গত দুই সপ্তাহে ঢাকায় অনুভূত হয়েছে অন্তত সাত দফা কম্পনযার ছয়টিই উৎসাহিত হয়েছে নরসিংদীর একই অঞ্চলে। ঠিক এই ধারাবাহিকতা নিয়েই বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা আরও জোরালো হচ্ছে।

ধারাবাহিক কম্পন: উদ্বেগ বাড়াচ্ছে কেন?

আবহাওয়া অধিদফতরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির বলছেন, বড় একটি কম্পনের পর যে ধারাবাহিক ছোট কম্পনগুলো হচ্ছে, সেগুলোকে গবেষণায় আফটারশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।অর্থাৎ ভূগর্ভে এখনো চাপের সমন্বয় হচ্ছেযা কখনো কখনো বড় ধরনের ভূমিকম্পের পথও তৈরি করে দিতে পারে।

২১ নভেম্বরের বড় কম্পনের পর মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে নরসিংদীতে আরও তিনটি কম্পন রেকর্ড হয়। এর মধ্যে একটি ছিল ৪.৩ মাত্রার। এরপর ২৭ নভেম্বর ঘোড়াশালে ৩.৬ মাত্রার কম্পন এবং ৪ ডিসেম্বর শিবপুরে আবার ৪.১ মাত্রার ভূমিকম্প।

ভূমিকম্প বিজ্ঞানীরা বলছেনএকই অঞ্চলে ধারাবাহিক ঝাঁকুনি ভূগর্ভে চাপ বৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।যদিও সব আফটারশক বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়, তবু এমন ঘন কম্পন ভবিষ্যৎ আশঙ্কা বাড়ায়।

বাংলাদেশ ভূকম্পীয়ভাবে কোথায় দাঁড়িয়ে?

ভূগোলগতভাবে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সক্রিয় প্লেট সীমান্তে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে দেশের বড় ভূমিকম্পের দুটি প্রধান উৎস রয়েছে

১. ডাউকি ফল্ট (Dauki Fault)

শিলং মালভূমির পাদদেশ থেকে ময়মনসিংহজামালগঞ্জ হয়ে সিলেট পর্যন্ত ৩৫০ কিলোমিটার বিস্তৃত।এই ফল্টটি অতীতে বড় বড় ভূমিকম্পের জন্ম দিয়েছে এবং এখনো সক্রিয়।

২. সিলেটচট্টগ্রামটেকনাফ করিডর

এ অঞ্চলটি ইন্দোবর্মা সক্রিয় প্লেটের অংশ, যা সোজা সুমাত্রা পর্যন্ত যুক্ত।ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের ভাষায়এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে হাইরিস্ক সিসমিক জোন।

এই দুই উৎসের কারণে বাংলাদেশে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবসময়ই বিদ্যমানএটা গবেষকদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ।

ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ মানচিত্র

বিশেষজ্ঞদের করা ৩২টি এলাকার জরিপে দেখা যায়ঢাকার দক্ষিণ অংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।এর প্রধান কারণ:

* অনিয়ন্ত্রিত ঘনবসতি

* দুর্বল ভবন কাঠামো

* সরু সড়ক

* উদ্ধারকাজ পরিচালনায় সীমাবদ্ধতা

ঢাকার যে ১৫টি এলাকা বিশেষ ঝুঁকিতেসবুজবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, কাফরুল, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর, গাবতলী, উত্তরা, সূত্রাপুর, শ্যামপুর, মানিকদী, মোহাম্মদপুর, পল্লবী, খিলগাঁও ও বাড্ডা।

উত্তরাঞ্চলের নতুন বসতিগুলোকেও একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ সেখানে মাটির স্তর দুর্বল এবং দ্রুত নগরায়ণ কাঠামোগত ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

যে প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকার খুব কাছে ধারাবাহিক কম্পন কি বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?

বিশেষজ্ঞরা সরাসরি হ্যাঁ বা না বলছেন না। তবে সতর্ক করছেনধারাবাহিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার কম্পন মানে ভূগর্ভে শক্তি জমছে।এটি উপেক্ষা করা যাবে না। নগর পরিকল্পনা, ভবন কাঠামো এবং উদ্ধার সক্ষমতা এখনই শক্তিশালী করতে হবে।

ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকম্প প্রবণ শহরগুলোর একটি। নাগরিক ঘনত্ব, ভবন কাঠামো, ফাটলভূমিসব মিলিয়ে একটি মাঝারি মাত্রার কম্পনও বড় বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।

নরসিংদীতে ধারাবাহিক কম্পন তাই শুধু ভূমিকম্প বিজ্ঞানের ঘটনা নয়এটি এক সতর্ক ঘণ্টা, যেটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে যে প্রস্তুতি নেওয়াই একমাত্র পথ।


Copyright (c) 2019-2026 bzamin24.com